রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইনক্রিমেন্ট। সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ দেশের প্রাথমিক শিক্ষার একটি বিশাল এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহনকারী কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকারা আজও রয়ে গেছেন চরম বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। নামমাত্র বেতনে মানবেতর জীবনযাপন করা এই শিক্ষক সমাজের খবর রাখার যেন কেউ নেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেন এবং নুরানি মক্তব বা মাদ্রাসোগুলো দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের একটি বিরাট সংখ্যক কোমলমতি শিশু এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা ও মানসম্মত ইংরেজি বা ধর্মীয় শিক্ষার পসরা সাজিয়ে বসেন এই শিক্ষকরা। অথচ তাদের নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি, নেই কোনো সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো বা চাকরির নিরাপত্তা।
বেতন নামমাত্র, নেই কোনো সুরক্ষাবলয়
বেশিরভাগ কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসায় একজন শিক্ষককে মাসিক মাত্র ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকার বিনিময়ে ফুলটাইম দায়িত্ব পালন করতে হয়। বর্তমান বাজারদরের এই ঊর্ধ্বমুখী বাজারে এই সামান্য অর্থে একটি পরিবার চালানো অসম্ভব। নেই কোনো উৎসব ভাতা (বোনাস), চিকিৎসা ভাতা কিংবা প্রভিডেন্ট ফান্ডের সুবিধা। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে তিলে তিলে একটি প্রজন্ম গড়ার কারিগররা যখন বার্ধক্যে পৌঁছান, তখন তাঁদের ভাগ্যে জোটে না কোনো পেনশনের নিশ্চয়তা।
নুরানি মাদ্রাসার এক শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা দিনের পর দিন কোমলমতি শিশুদের কোরআন শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা দিই, অথচ মাস শেষে বাজার করতে গিয়ে চোখের পানি ফেলতে হয়। বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও আমাদের বেতন বাড়ে না। আমাদের কি পরিবার নেই, আমাদের কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই?"
ম্যানেজমেন্টের খেয়ালিপনা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসাগুলো মূলত পরিচালিত হয় ব্যক্তি উদ্যোগে গঠিত পরিচালনা পর্ষদ বা স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে। ফলে প্রতিষ্ঠানভেদে বেতনের কোনো সামঞ্জস্য নেই। কোনো কোনো স্কুল ভালো ফি আদায় করতে পারলে শিক্ষকদের কিছু বেশি দিতে পারলেও সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানই ধুঁকে ধুঁকে চলে। করোনা মহামারী বা অন্যান্য সংকটের সময় এসব প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষক মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন, অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি জাতির ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। আর সেই ভিত্তিকে যারা শক্তিশালী করছেন, তাঁদের এভাবে বঞ্চিত রাখা আত্মঘাতী। সরকারি নজরদারির অভাব এবং কোনো নীতিমালা না থাকায় মালিকপক্ষ বা পরিচালনা কমিটি শিক্ষকদের ওপর যদৃচ্ছা নিয়ম চাপিয়ে দেয় এবং সামান্য কারণে চাকরিচ্যুত করার হুমকি থাকে সার্বক্ষণিক।
প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের দাবি, কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসাগুলোকে সম্পূর্ণ অবহেলা না করে শিক্ষা বোর্ডের বা সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। শিক্ষকদের জন্য নুন্যতম একটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বা বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত, যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মানতে বাধ্য থাকবে। পাশাপাশি সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ অনুদান চালুর মাধ্যমে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
মেধাবী ও উদীয়মান যুবসমাজকে শিক্ষকতা পেশায় ধরে রাখতে না পারলে শিক্ষার মান দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে। তাই প্রশ্ন উঠেছে—সমাজের মেরুদণ্ড গড়ার কারিগর এই শিক্ষকদের কষ্টের কথা নীতিনির্ধারকরা কবে শুনবেন? সবার জন্য বেতন কাঠামো ও অধিকার নিশ্চিত হলেও, কিন্ডারগার্টেন ও নুরানি মাদ্রাসার শিক্ষকদের এই বঞ্চনার অবসান হবে কবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।