সব সময় সব খানে


শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

৭ ভাদ্র ১৪৩৩

সব সময় সব খানে!
শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
**সদ্যপ্রাপ্ত

>> গণভোটের রায় বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: জামায়াতের অবস্থানে কি দ্বিচারিতা?

>> ফুলবাড়ীতে সীমান্তের ১৫ যুবককে ইলেকট্রিক্যাল প্রশিক্ষণ দিল বিজিবি

>> সানন্দবাড়ীতে ৭ কেজি গাঁজাসহ নারী আটক

>> হাতীবান্ধায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

>> মীরসরাইয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার: বিশেষ সম্মাননা পেলেন ওসি ফরিদা ইয়াসমিন

>> শীত আসার আগেই কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপে মুগ্ধ পর্যটকরা।

>> ফুলবাড়ীতে বিজিবির অভিযানে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকার মাদক জব্দ

>> হাতীবান্ধায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

>> ফরিদপুরে ওই যে বর্তমান যুগের লেটেস্ট শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে স্কুলড্রেস, ব্যাগ, জুতা বিতরণ করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

>> প্রিমিয়ার সিমেন্ট ও হাফিজ স্টোরের উদ্যোগে কমলনগরে জমজমাট প্রীতি ফুটবল ম্যাচ

আপনি পড়ছেন : সম্পাদকীয়

গণভোটের রায় বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: জামায়াতের অবস্থানে কি দ্বিচারিতা?


মোঃ কামরুল হাসান

eshomoy.com || 2026-08-21 09:57
গণভোটের রায় বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: জামায়াতের অবস্থানে কি দ্বিচারিতা?
গণভোটের রায় বনাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: জামায়াতের অবস্থানে কি দ্বিচারিতা?

গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যখন রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো মৌলিক কাঠামো সম্পর্কে তাদের মতামত প্রকাশ করে, তখন সেই গণরায়কে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে যখন সেই রায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা বলা হয়, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়—তারা নিজেরাও সেই গণরায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখছে কি না, তা নিশ্চিত করা।

এই জায়গাতেই জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে।

প্রশ্নটি সরল—যে গণভোটের রায়কে তারা জনগণের ম্যান্ডেট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই রায়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পদ্ধতি বা কাঠামোর কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সেই কাঠামোকে বাস্তবে অনুসরণ করেছে, নাকি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তার বাইরে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে?

গণভোটের রায় কি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান?

গণভোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত উৎস কোনো রাজনৈতিক দল নয়, জনগণ।

সংসদীয় নির্বাচনে জনগণ কোনো দল বা প্রার্থীকে বেছে নেয়। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্নের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেয়। ফলে গণভোটে জনগণের অনুমোদিত কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক দল নিজেদের সুবিধামতো গ্রহণ ও বর্জন করতে পারে কি না—এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন।

আইনের মৌলিক নীতিই হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন ও জনগণের বৈধ ম্যান্ডেটকে খণ্ডিতভাবে ব্যবহার করা যায় না।

একদিকে গণভোটের রায়কে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা এবং অন্যদিকে একই রায়ের অন্তর্নিহিত কোনো বিধান বা কাঠামো নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সেটি এড়িয়ে যাওয়া—এ ধরনের অবস্থানকে অন্তত রাজনৈতিকভাবে দ্বৈত মানদণ্ড হিসেবে প্রশ্ন করা যায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: এখানেই মূল সাংবিধানিক প্রশ্ন

জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নির্বাচন করা বা কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করা নিজেই বেআইনি—এমন কথা বলা যাচ্ছে না।

বরং আইনি বিশ্লেষণের জায়গাটি আরও সূক্ষ্ম।

প্রশ্ন হচ্ছে—কোন সাংবিধানিক ব্যবস্থার অধীনে তারা এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে?

যদি গণভোটের রায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি জনগণ অনুমোদন করে থাকে এবং সেই রায়ের বাস্তবায়নকে তারা নিজেরাই রাজনৈতিকভাবে দাবি করে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় সেই একই কাঠামোকে মান্য করার প্রশ্নটি তাদের সামনে আসবেই।

এখানে consistency of constitutional conduct—অর্থাৎ সাংবিধানিক আচরণের ধারাবাহিকতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের কোনো সাংবিধানিক সংস্কারকে জনগণের রায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, আবার প্রয়োজনের সময় সেই রায়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না—এমন যুক্তি তোলা যেতে পারে।

“গণরায়”কে বেছে বেছে ব্যবহার করা যায় কি?

ধরা যাক, গণভোটে জনগণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুমোদন করেছে।

তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে দুটি সুস্পষ্ট অবস্থান থাকার কথা—

প্রথমত, তারা গণভোটের রায়কে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের দাবি করবে এবং সেই অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পক্ষে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, তারা যদি মনে করে গণভোটের কোনো অংশ বাস্তবায়নযোগ্য নয় বা সাংবিধানিকভাবে অসঙ্গত, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও যুক্তিসংগত রাজনৈতিক অবস্থান নেবে।

কিন্তু একই সঙ্গে গণভোটের রায়কে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেই রায়ের কোনো অংশকে পাশ কাটানো—এটি রাজনৈতিক নৈতিকতার দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে ঘিরে “দ্বিচারিতা” শব্দটি রাজনৈতিক বিতর্কে জায়গা করে নিতে পারে।

তবে আইনি ভাষায় “প্রতারণা” শব্দটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ প্রতারণা একটি গুরুতর আইনি অভিযোগ; এর জন্য নির্দিষ্ট আইনগত উপাদান, অভিপ্রায় এবং কার্যকলাপের প্রমাণ প্রয়োজন। তাই প্রমাণ ছাড়া সরাসরি “আইনগত প্রতারণা” বলা অপেক্ষা “গণরায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা” বা “গণভোটের ম্যান্ডেটের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণ” বলা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

জনগণের রায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল জনগণের প্রতিনিধি; জনগণের ঊর্ধ্বে নয়।

একটি দল নির্বাচনে জিততে পারে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে, কিংবা কোনো রাষ্ট্রীয় পদে প্রার্থী দিতে পারে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক ক্ষমতা জনগণের সাংবিধানিক ম্যান্ডেটের বিকল্প নয়।

গণভোটে জনগণ যদি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুমোদন দিয়ে থাকে, তাহলে সেই কাঠামো বাস্তবায়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণও সেই ম্যান্ডেটের আলোকে বিচার করা স্বাভাবিক।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতি সামনে আসে—

ক্ষমতার বৈধতা শুধু নির্বাচনী বিজয় থেকে আসে না; সাংবিধানিক বৈধতা আসে সংবিধান, আইন এবং জনগণের বৈধ ম্যান্ডেটের প্রতি আনুগত্য থেকে।

জামায়াতের জন্য প্রশ্নগুলো তাই আরও কঠিন

জামায়াতে ইসলামীকে এখন কয়েকটি সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—

১. গণভোটের রায়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পদ্ধতি নির্ধারিত বা অনুমোদিত হয়েছে, সেটি তারা কি নিঃশর্তভাবে মেনে নেয়?

২. যদি মেনে নেয়, তাহলে সেই কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে?

৩. যদি গণভোটের রায়ের কোনো অংশ তারা বাস্তবায়নযোগ্য মনে না করে, তাহলে গণভোটের কোন অংশ তারা প্রত্যাখ্যান করছে এবং কেন?

৪. জনগণের রায়ের পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন করার পর একই রায়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া কি রাজনৈতিকভাবে স্ববিরোধী নয়?

৫. গণভোটের রায় যদি জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে কোনো রাজনৈতিক দল কি সুবিধামতো সেই রায়ের একটি অংশ গ্রহণ এবং অন্য অংশ উপেক্ষা করতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিতর্কটি চলতেই পারে।

আইনের চোখে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ

সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বই নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সংসদ, নির্বাহী ক্ষমতা কিংবা বিচার বিভাগের কাঠামো—প্রতিটি বিষয়ই সাংবিধানিক বৈধতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দল যখন একটি সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন সেই সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করার রাজনৈতিক দায়ও তার ওপর বর্তায়।

এখানেই constitutional accountability বা সাংবিধানিক জবাবদিহির ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে বলতে পারে না—“গণভোটের রায় আমাদের পক্ষে যখন, তখন সেটি জনগণের ম্যান্ডেট; আর যখন সেটি আমাদের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তখন সেটি আলাদা বিষয়।”

গণরায় যদি সত্যিই গণরায় হয়, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ রায়—খণ্ডিত রাজনৈতিক সুবিধার উপকরণ নয়।

তবে একটি আইনি সতর্কতা জরুরি

এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলা যাবে না যে জামায়াতে ইসলামী আইন ভঙ্গ করেছে। কোনো নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে সংবিধান, সংশ্লিষ্ট আইন, গণভোটের আনুষ্ঠানিক প্রশ্ন ও ফলাফল এবং সেই রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত সাংবিধানিক/আইনি বিধানের সমন্বিত পাঠের মাধ্যমে।

অর্থাৎ রাজনৈতিক অসঙ্গতি এবং আইনগত অবৈধতা—দুটি এক জিনিস নয়।

জামায়াতের আচরণ রাজনৈতিকভাবে দ্বিচারিতাপূর্ণ কি না—এটি একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন।

কিন্তু তারা আইন বা সংবিধান লঙ্ঘন করেছে কি না—এটি একটি আইনগত প্রশ্ন, যার উত্তর দিতে হলে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান দেখাতে হবে।

এই পার্থক্যটি বজায় রাখলেই সমালোচনাটি আরও শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং আইনসম্মত হয়।

শেষ কথা

গণতন্ত্রে জনগণের রায়কে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা সহজ। কঠিন হলো—সেই রায়ের প্রতি নিজের রাজনৈতিক আচরণেও একই রকম আনুগত্য দেখানো।

জামায়াতে ইসলামী যদি গণভোটের রায়কে জনগণের ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তকেও সেই গণরায়ের আলোকে ব্যাখ্যা করতে হবে।

গণভোটের রায় যদি মানতে হয়—তাহলে পুরো রায়ই মানতে হবে। আর যদি কোনো অংশ নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—কোন অংশ, কেন এবং কোন সাংবিধানিক ভিত্তিতে তা তারা প্রশ্ন করছে।

কারণ গণতন্ত্রে জনগণের রায়কে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী গ্রহণ-বর্জন করার সুযোগ নেই।

সুতরাং আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি জামায়াতের প্রার্থী দেওয়া নিয়ে নয়; বরং—

“গণভোটের রায়ের প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আনুগত্য কি নীতিগত, নাকি রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক?”

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকেই নয়, দেশের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক রাজনীতির চরিত্রকেও অনেকাংশে নির্ধারণ করবে।