ভাষার মাসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থাকে পুষ্পময়, অন্য মাস গুলোতে তা হয়ে যায় প্রেমনিবেদন কেন্দ্র ও আড্ডার আসর!
আরও পড়ুন, ট্রাক চালকরা আশেপাশের জনপদে গিয়ে বাসার বাথরুম থেকে মল সংগ্রহ করছে জ্বালানী হিসেবে
ভাষা শহীদের প্রতি ভালবাসা কি তাহলে এক মাসের জন্য? বছরের ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই শহীদ মিনারের গুরুত্ব বেড়ে যায়। চারদিকে নিরাপত্তার বেষ্টনী, অথচ অন্য মাসে সেটার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না। তাহলে কি সালাম জাব্বার বরকতরা সম্মানিত মাত্র এক মাসের জন্য?
বাংলা ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। এই দিনটি বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস হিসেবেও পালিত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলা ভাষার দাবিতে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। সালাম জাব্বার, বরকতের তাজা প্রাণ বলিদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলা কে রাষ্ট্র ভাষা এবং উপহার দিয়েছে বাঙালি জাতিকে মাতৃ ভাষা হিসাবে। তাদের স্বরণ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় শহীদ মিনার।
শহিদ মিনার কেন নির্মাণ করা হয়? এই কথার উত্তরে বলা যায় যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণীয় করে রাখতে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। এর মাধ্যমে ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করা অনেক সহজ হয়ে যায়, সহজ হয়ে যায় অমর ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা জানানোর কঠিন কাজটাও। সেজন্যই '৫২-এর ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন যারা, তাদের স্মরণে নির্মিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
সর্বপ্রথম অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু করে রাত্রির মধ্যে তা' সম্পন্ন করেন প্রথম শহীদ মিনার৷ পরবর্তীতে এই শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রহমান। ১৯৫৭ সালে নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে শুরু করা হয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ। এরপর ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন।
গোটা বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের আত্মকথা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি ভাষার মাস ছাড়া বাকি সময় পরে অযত্নে ৷ তাহলে কি শুধু ভাষার মাসের জন্যই কেবল সালাম, জাব্বার,বরকরতের আত্মদানের কথা মাথায় রেখে শহীদ মিনারকে শ্রদ্ধা এবং সম্মান নিবেদন করবো? বাকি সময়টা কি তাহলে কিশোর- কিশোরীদের প্রেমনিবেদন কেন্দ্র? এমনটা ঘটতে থাকলে শহীদদের প্রতি আমাদের ভালবাসা প্রকাশ পায় নাকি আমরা তাদেরকে অসম্মান জানিয়ে এইটা বলছি তো না, কেন আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য জীবন দিলি, এইটাই তোদের প্রতিদান।
ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া দেখায় যায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কিশোর-কিশোরিদের আড্ডাখানা ৷ সাধারণ মানুষের দর্শনীয় স্থান হলেও থাকেনা কোন প্রশাসনিক আইনে ব্যবস্থ। দেখা যায় না আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যকে । যে যার মতো জুতা পায়ে ঘুড়ে বেড়ায় শদীদ মিনারের প্রতিটি স্তরে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের প্রেম নিবেদন ছাড়াও সন্ধ্যার পরে দেখা যায় সেখানে বসে মাদকদ্রব্য সেবন করতে। তাহলে কি ভাষা শহীদরা এই জন্যই তাদের জীবন দিয়ে বাংলা ভাষাকে আমাদের মাতৃভাষা করে গিয়েছেন।
আমরা জাতী হিসাবে খুবই আবেগপ্রবণ। আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে নিজেকে দেশপ্রেমিক মনে করি। শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাই, তাও আবার ৬০% লোক দেশপ্রেমিক হিসাবে শ্রদ্ধা জানাতে যায় কিনা এই ব্যাপারে আমি সন্দিহান। আর ভাষার মাসটা চলে গেলে সেখানে প্রেমনিবেদন করিতে যাই,এইটাই আমাদের মূল্যবোধ।
ফেব্রুয়ারিতে যেখানে বাড়ি থেকে খালি পায়ে শহীদ মিনারে আসি সম্মান দিতে। ফেব্রুয়ারি মাস চলে গেলে সেই শহীদ মিনারে পায়ে ময়লা লাগবে বলে জুতা পায়ে প্রবেশ করি মিনার সর্বোচ্চ স্তরে। এই হলো জাতি হিসাবে ভাষা শহীদেদের প্রতি আমাদের সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। সেখানে না থাকে আমাদের কোন অনুশোচনা আর না থাকে প্রশাসনের কোন দায়িত্ব।
বিষয় গুলো প্রশাসনের নজর বন্দী করা উচিত বলে আমি মনে করি। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়াও সার্বক্ষণিক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মোতায়ন করা এবং সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা উচিত।
আমরা আমাদের অতীত ভুলে গেলে চলবেনা৷ অতীত মনে রাখতে হবে। অতীতের স্মৃতি বুকে ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মকে জানান দিতে হবে। দেশপ্রেম আগেও ছিলো এখনো আছে। তোমরাও তা ধরে রেখো৷