বিদায়ী অর্থবছরেও ধাক্কা লেগেছে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে। গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ব্যাংক আমানতে, যা বিগত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, রেমিট্যান্সের পতন ও ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় বিদায়ী অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি ব্যাপকহারে কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানত (ডিমান্ড ও টাইম ডিপোজিট) পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। ওই বছর আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ২৯ শতাংশ। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছর আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে হয় ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ওই অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ হয়। ওই সময়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৮০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন- ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে সমালোচনাকারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি সুবিধা গ্রহণ করছে : প্রধানমন্ত্রী

তবে কভিড-১৯ মহামারির শুরুতে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছিলো। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয় ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ওই অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন- লক্ষীপুর থেকে ভোলায় আসার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মেঘনা নদীর চরে ফেরি
কভিড-পরবর্তী সময় ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আবার মুখ থুবড়ে পড়ে অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচক। এরপর কমতে থাকে ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি। ২০২১-২২ অর্থবছরে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে হয় ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ। ওই অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ গত অর্থবছর আমানতের প্রবৃদ্ধি আরও কমে হয় ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাতের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৯৫ হাজার ২৬০ কোটি টাকায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতের আমানত প্রবৃদ্ধি কমার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় কাজ করেছে। এখন দেশে মূল্যস্ফীতির চাকা ঊর্ধ্বমুখী। গত অর্থবছর শেষে রেকর্ড মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। ফলে জিনিসপত্রের দাম হুহু করে বাড়ছে। তাতে মানুষের সঞ্চয়ে টান পড়েছে, এতে আমানত কমছে ব্যাংকের। বর্তমানে ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ মিলছে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। এর মধ্যে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকে টাকা রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেয়া যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের খরচ বেড়ে গেছে। এতে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খরচ করেছে। নতুন করে সঞ্চয় করার সুযোগ ছিল না।
আরও পড়ুন- শাহজাদপুরে আ'লীগকে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
অন্যদিকে ব্যাংক খাতে ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তবে অর্থবছরের শেষের দিকে সেই সংকট কিছুটা দূর হয়েছে। অবশ্য প্রবৃদ্ধি কমার ক্ষেত্রে এর প্রভাব রয়েছে। এছাড়া বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নেমেছিল। রেমিট্যান্সের কারণে যে আমানত তৈরি হতো তা কমে গিয়েছিল। এসব কারণে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে আসছে।

জানতে চাইলে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
আরও পড়ুন- হারিয়ে যাওয়ার ১৬ বছর পর বাড়ি ফিরলেন সাহাবুল
এমরানুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্য ও স্থায়ী আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন। ছোট আমানতকারীরা তাদের সঞ্চয় ভেঙে চাহিদা মেটাচ্ছেন। জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে অনেক পরিবার সঞ্চয় বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া ডলারের দর বৃদ্ধির কারণে টাকার মান কমে গেছে। টাকার মান কমাতে আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। এর পরের অর্থবছরে বেড়ে হয় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০১৯-২০২০ অর্থবছর শেষে ছিল ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছর কমে হয় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। সর্বশেষ গত অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়।
আরও পড়ুন- ঝিনাইগাতীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার ৪
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর শেয়ার বিজকে বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে ডলার সংকটের কারণে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। যার কারণে বাজার থেকে অনেক টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা চলে যাওয়া মানে অর্থনীতিতে ওই টাকা নেই। অর্থনীতিতে এ পরিমাণ টাকা না থাকার কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়েছে।

আরও পড়ুন- ভোলায় বৈরী আবহাওয়ায় ১১টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে নিখোঁজ ৬
তিনি বলেন, বিদায়ী অর্থবছরে দেশে অধিক মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে। মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। সঞ্চয় করার সক্ষমতা কমে গেছে। ব্যয় যতটা বেড়েছে, বাড়েনি ততটা আয়। তাই মানুষ সঞ্চয়ও ভেঙে খেতে বাধ্য হচ্ছে। নতুন করে সঞ্চয় হচ্ছে না। এছাড়া গত বছর ব্যাংক ঋণের অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে মানুষের। এর একটা প্রভাবও লক্ষ করা গেছে। সাধারণত গ্রামের মানুষ বেশি উদ্বেগজনক হয়। তাই তারা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। ফলে ব্যাংক খাতের আমানতের প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমছে।

আরও পড়ুন- ধর্ষনের পর হত্যা : অগ্রগতি নেই সেই আলোচিত উপবালা হত্যা মামলার
ই-সময়/আর.এম/এমআরএম