সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ২৫০ টির অধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অনেক সময় রোগীরা ভুল রিপোর্টের কারণে পঙ্গুত্ববরণসহ অকালে জীবন হারাতে হয় অনেকের। ডাক্তারদের সেবা দিতে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলায় বিভিন্নস্থানে গড়ে উঠেছে ২৫০ টির অধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সরকারি নিয়ম-নীতিকে উপেক্ষা করে বছরের পর বছর অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠানে সেবার নামে রমরমা বাণিজ্য করে চলেছে । অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই কোন প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ টেকনোলজিস্ট। ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের ভুল প্যাথলজি রিপোর্টের গ্লানি টানতে হচ্ছে রোগীকে। একই পরীক্ষা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফলে দিশেহারা হচ্ছেন দরিদ্র রোগীরা।
একাধিকবার পরীক্ষা করে বিভ্রান্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছেন সরকারি হাসপাতালে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালের ডাক্তারা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরিক্ষার জন্য তাদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান। অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব পরীক্ষা থেকে ডাক্তারা ৫০-৬০% পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন- জুড়ীতে পুলিশের করা মামলায় মৃত ব্যক্তিকে আসামী
হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নেই কোন গুরুত্ব। হাসপাতালের রাসায়নিক বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছাড়া দেয়া হয়না পরিবেশ ছাড়পত্র, আর পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া মেলেনা প্রাতিষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন। তাই সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই বৈধ কোন লাইসেন্স। অবৈধ চিকিৎসা কেন্দ্রে কতটা সঠিক চিকিৎসা দেয়া যায় সেটাও নিয়েও সুশীল সমাজের রয়েছে নানা প্রশ্ন।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই সাতক্ষীরা শহরসহ সাত উপজেলায় চলছে অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক। ফলে দিনের পর দিন দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত ও সর্বশান্ত হচ্ছে অসহায় মানুষ। আর লাভবান হচ্ছেন কতিপয় দালাল ও অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা। সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ২৫০টির অধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও চলতি বছরে অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকরা নবায়ন করেননি তাদের লাইসেন্স।
এছাড়া অনলাইনে লাইসেন্সের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের আবেদন করছেন। তবে সদরে অবস্থিত ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এসডি হাসপাতাল, ডক্টরস ল্যাবসহ বেশ কয়কটি প্রতিষ্ঠান ভিজিট করে অনুমতিপত্র পেলেও অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এখনও ভিজিট ও করেননি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সাতক্ষীরা জেলা সদর হাসপাতাল, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আশপাশেই রয়েছে অনেক বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ।

বিশেষ করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সামনে ও সিভিল সার্জন অফিসের নাকের ডগায় এসব অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠলেও চোখে দেখননা স্বাস্থ্য বিভাগর কর্মকর্তারা। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের মানা হয়না কোন নিয়মকানুন। অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই যথাযথ লাইসেন্স। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের আবেদন করেই শুরু করেছে কার্যক্রম। আবার যাদের লাইসেন্স আছে তারাও মানছেন না নিয়মকানুন। অভিযোগ রয়েছে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সাথে আঁতাত করেই চলছে এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
এছাড়া সদর ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মচারীদের একটা অংশ এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে জড়িত। এজন্য কোন নিয়মকানুন মানতে হয়না ওইসব প্রতিষ্ঠানের।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালর চারিপাশে গড়ে উঠেছে ক্রিস্টাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সুদরবন হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স, স্বপ্ন ক্লিনিক, স্বপা ক্লিনিক, মাহিনী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সততা ক্লিনিক, আনোয়ারা মেমোরিয়াল ক্লিনিক, বুশরা হাসপাতাল, পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সাতক্ষীরা ট্রমা সেন্টার, শেফা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সোনালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আল নূর হাসপাতাল, গাইনি হাসপাতাল, সানজানা নার্সিং হোম, নিরাময় ক্লিনিক, নাজমুল ক্লিনিক, একতা হাসপাতাল, ইটাগাছার ন্যাশনাল হাসপাতাল, পোস্ট অফিস মোড়ে সিটি ক্লিনিক, ফারহানা ক্লিনিক, কলারোয়া উপজেলায় মুন্না ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আরোগ্য ক্লিনিক, কলারোয়া ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার,তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার লোকনাথ নার্সিং হোম, তালা সার্জিকাল ক্লিনিক,
আরও পড়ুন- নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেলন এমপি: দক্ষতার পরিচয় দিলেন উপজেলা প্রকৌশলী
মা ক্লিনিক, আশাশুনি উপজেলায় রাবেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বুধহাটার মা সার্জিকাল ক্লিনিক, নিবেদিতা ক্লিনিক, সোনার বাংলা ক্লিনিক, কালিগঞ্জ উপজেলায় কালিগঞ্জ সার্জিকাল ক্লিনিক, আহসানিয়া সার্জিকাল, শ্যামনগর উপজেলায় রিডা প্রাইভেট হাসপাতাল, সুন্দরবন, ক্লিনিক, এ্যপোলো হাসপাতাল, সুন্দরবন নাসিং হোম, নগর প্রাইভেট হাসপাতাল, বংশীপুর নার্সিং হোম, আনিকা ক্লিনিক, সেবা নার্সিং হোম, শামিমা ক্লিনিক, আল শেফা ক্লিনিক, ফানান্দ হাসপাতাল। এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই রোগ নির্ণয়ের জন্য মানসম্মত যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত সেবিকা ও ল্যাব টেকনালজিস্ট। সরকারি হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকে রোগী ভাগিয়ে আনেন দালালরা এমন ও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রায় সব ক্লিনিকে বিভিন্ন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।
তবে নিয়মিত ওই সব ক্লিনিকে পাওয়া যায় না তাদের। খন্ডকালীন চিকিৎসক দিয়ে ক্লিনিক গুলোতে চলছে জটিল অস্ত্রাপচারসহ নানা চিকিৎসা। অনুমোদনহীন এসব হাসপাতালে চিকিৎসার নামে ব্যবসা, প্রতারণা, রোগী ভাগাভাগীর অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই। এছাড়াও এসব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সময়ই ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও ওঠে প্রতিনিয়ত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্লিনিকের পরিচালক বলেন, যেসব শর্ত মেনে লাইসেন্স করাতে হয় তার অধিকাংশ শর্তই বেসরকারি হাসপাতাল গুলো মানেনা। আর মানা সম্ভবও না। শর্ত অনুযায়ী ক্লিনিক ও হাসপাতালের জন্য আবেদন করাও প্রায় অসম্ভব। আর আবেদনের পর একটি মহলকে ম্যানেজ করতে না পারলে বছরের পর বছর গেলেও ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিদর্শনে আসেননা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. শেখ সুফিয়ান রোস্তম বলেন, অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ কর দেওয়া হয়েছে, জরিমানাও করা হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের।
আরও পড়ুন- কোনো অপশক্তি নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না: কাদের
ইসময়/আরএম/এমআরএম